চেক ডিজঅনার মামলা (১৩৮ ধারা, এন আই অ্যাক্ট): লিগ্যাল নোটিশ ও মামলা দায়েরের নিয়মাবলী
আপনি ব্যবসায়িক পার্টনারকে ৮ লাখ টাকা ধার দিয়েছেন। বিনিময়ে একটি চেক পেয়েছেন। ব্যাংকে জমা দিতেই চেকটি ফেরত এলো, কারণ লেখা "অপর্যাপ্ত তহবিল"। এখন কী করবেন?
ঘাবড়াবেন না, কিন্তু দেরিও করবেন না। চেক ডিজঅনার মামলায় (Cheque Dishonour Case) প্রতিটি ধাপের সময়সীমা আইনে নির্দিষ্ট করা আছে। একটি সময় মিস করলে মামলা শুরুর আগেই দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
এই লেখায় আপনি জানবেন লিগ্যাল নোটিশ কীভাবে পাঠাবেন, মামলা কখন ও কোথায় করবেন এবং ২০২৬ সালে কী কী নিয়ম বদলেছে।
চেক ডিজঅনার কী এবং ১৩৮ ধারা কী বলে?
ব্যাংক যখন কোনো চেকের টাকা না দিয়ে চেকটি ফেরত দেয়, তখন তাকে ডিজঅনার (Dishonour) বলে। বাংলাদেশে এটি হস্তান্তরযোগ্য দলিল আইন, ১৮৮১ (Negotiable Instruments Act, 1881) এর ১৩৮ ধারা অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে।
চেক ফেরত আসার কারণ যদি হয় হিসাবে টাকা কম থাকা, অথবা ব্যাংকের সঙ্গে ঠিক করা সীমার চেয়ে বেশি অঙ্কের চেক দেওয়া, তাহলে যিনি চেক দিয়েছেন (চেক-দাতা / Drawer) তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হতে পারেন।
মামলা করতে পারেন চেকের প্রাপক (Payee) বা যথাযথ ধারক (Holder in due course)।
১৩৮ ধারায় শাস্তি কী?
শাস্তি হলো সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা চেকের অঙ্কের ৩ গুণ পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।
জরিমানার টাকা আদায় হলে তা থেকে চেকের মূল্য পর্যন্ত অংশ চেক-গ্রহীতাকে দেওয়া হয়। অনাদায়ী অংশের জন্য দেওয়ানি আদালতে যাওয়ার অধিকারও বহাল থাকে।
বাস্তবে আদালত টাকা আদায়ের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। সাম্প্রতিক এক রায়ে হাইকোর্ট বিভাগ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে এ ধরনের মামলার মূল উদ্দেশ্য চেকের অর্থ আদায়, আসামিকে কারাদণ্ড দেওয়া নয়।
মামলার ধাপ একনজরে
| ধাপ | কী করবেন | সময়সীমা |
|---|---|---|
| ১ | ব্যাংকে চেক জমা | চেকের মেয়াদের মধ্যে (সাধারণত ৬ মাস) |
| ২ | ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ | ব্যাংক চেক ফেরত দেওয়ার সময় |
| ৩ | লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো | ব্যাংকের খবর পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে |
| ৪ | চেক-দাতার পরিশোধের সময় | নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিন |
| ৫ | মামলা (নালিশি) দায়ের | মামলার কারণ তৈরির এক মাসের মধ্যে |
ধাপ ১: সময়মতো চেক জমা দিন
চেকের মেয়াদের মধ্যে ব্যাংকে জমা দিন। সাধারণভাবে চেকে লেখা তারিখ থেকে ৬ মাস পর্যন্ত চেক বৈধ ধরা হয়। শেষ দিনের জন্য অপেক্ষা করবেন না।
ধাপ ২: ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ করুন
ব্যাংক কারণ উল্লেখ করে একটি চেক ফেরত স্লিপ (ডিজঅনার স্লিপ) দেয়। মূল কপিটি যত্নে রাখুন। ব্যাংকের কাছ থেকে চেক ফেরতের এই খবর পাওয়ার তারিখ থেকেই আপনার প্রথম সময়সীমা শুরু হয়।
ধাপ ৩: ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান
ব্যাংকের কাছ থেকে চেক ফেরতের খবর পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেক-দাতার কাছে লিখিত দাবিনামা পাঠাতে হয়। একে লিগ্যাল নোটিশ (উকিল নোটিশ) বলে।
নোটিশে সাধারণত যা থাকা উচিত:
- আপনার ও চেক-দাতার পূর্ণ নাম ও ঠিকানা
- চেক নম্বর, তারিখ, অঙ্ক ও ব্যাংকের নাম
- ডিজঅনারের তারিখ ও কারণ
- ৩০ দিনের মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধের স্পষ্ট দাবি
নোটিশ অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে রেজিস্টার্ড ডাকে প্রাপ্তিস্বীকারসহ পাঠান। ডাকঘরের রসিদ ও প্রাপ্তিস্বীকার স্লিপ সংরক্ষণ করুন। একাধিক চেক ডিজঅনার হলে সাধারণত প্রতিটি চেকের জন্য আলাদা মামলা লাগে, তাই নোটিশ পাঠানোর আগেই অ্যাডভোকেটের সঙ্গে পরিকল্পনা করে নিন।
ধাপ ৪: ৩০ দিন অপেক্ষা করুন
নোটিশ পাওয়ার পর চেক-দাতা ৩০ দিন সময় পান। এর মধ্যে পুরো টাকা দিলে ১৩৮ ধারার অপরাধ গঠিত হয় না। না দিলে আপনার মামলার কারণ (Cause of Action) তৈরি হয়।
ধাপ ৫: এক মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করুন
আদালত শুধু চেকের প্রাপক বা যথাযথ ধারকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা আমলে নেন। মামলার কারণ তৈরির তারিখ থেকে এক মাসের মধ্যে এই অভিযোগ করতে হয়।
এটি একটি নালিশি মামলা (CR Case)। মামলা প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করতে হয়:
- মহানগর এলাকায়: চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (CMM) আদালত
- মহানগরের বাইরে: চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (CJM) আদালত
বিচার কোন আদালতে হবে? (২০২৬ সালের পরিবর্তন)
আগে: ২০২০ সালের হাইকোর্ট বিভাগের রায়ের পর চেক ডিজঅনার মামলার বিচার হতো যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে।
এখন: হস্তান্তরযোগ্য দলিল (সংশোধন) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৬৫ নং আইন) অনুযায়ী ১৪১ ধারার (সি) দফা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা অধ্যাদেশের পর এই আইন হয়েছে। এখন চেকের অঙ্কের ওপর নির্ভর করে বিচার কোথায় হবে:
| চেকের অঙ্ক | বিচারের আদালত |
|---|---|
| ৫ লাখ টাকার বেশি | মেট্রোপলিটন যুগ্ম দায়রা জজ বা যুগ্ম দায়রা জজ আদালত |
| ৫ লাখ টাকা বা তার কম | মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত |
সহজ কথায়, ৫ লাখ টাকা বা তার কম অঙ্কের মামলার বিচার ম্যাজিস্ট্রেট করেন। ৫ লাখ টাকার বেশি হলে যুগ্ম দায়রা জজ বিচার করেন। এতে উচ্চ আদালতের চাপ কমবে এবং ছোট অঙ্কের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়বে।
আপনার মামলা যদি এই পরিবর্তনের আগে দায়ের হয়ে থাকে, নতুন নিয়ম কীভাবে প্রযোজ্য হবে তা অ্যাডভোকেটের কাছে জেনে নিন।
মামলার আগে মধ্যস্থতা (মিডিয়েশন)
আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০ সংশোধন করে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে কিছু বিরোধে মামলা করার আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা (Mediation) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ২০২৫ সালে চালুর সময় কম অঙ্কের চেক ডিজঅনার মামলা এর তালিকায় ছিল। নিয়মটি জেলা ধরে ধরে চালু হচ্ছে।
তাই আপনার জেলায় এটি প্রযোজ্য কি না, তা আগেই জেনে নিন। মধ্যস্থতার কারণে এক মাসের মামলার সময়সীমা যেন পার না হয়ে যায়, সেদিকে সতর্ক থাকুন। মধ্যস্থতায় ব্যয় হওয়া সময় সময়সীমায় কীভাবে ধরা হবে, তা অ্যাডভোকেটের সঙ্গে আগেই আলোচনা করুন।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
- মূল ডিজঅনার চেক ও ব্যাংকের ফেরত স্লিপ
- লিগ্যাল নোটিশের কপি, ডাকঘরের রসিদ ও প্রাপ্তিস্বীকার স্লিপ
- লেনদেনের প্রমাণ: চুক্তিপত্র, ব্যাংক ট্রান্সফারের রেকর্ড, ইনভয়েস বা মেসেজ
- আপনার পরিচয়পত্র ও চেক-দাতার পূর্ণ ঠিকানা
- তারিখসহ ঘটনার ধারাবাহিক বিবরণ
একটি উদাহরণ (কাল্পনিক)
ধরুন, ১ মার্চ চেক ডিজঅনার হলো এবং সেদিনই আপনি ব্যাংকের স্লিপ পেলেন। ৩১ মার্চের মধ্যে নোটিশ পাঠাতে হবে। চেক-দাতা ৫ এপ্রিল নোটিশ পেলেন। তাহলে তাঁর ৩০ দিনের সময় শেষ হবে প্রায় ৫ মে। এরপর এক মাসের মধ্যে মামলা দায়ের করতে হবে।
তারিখ গণনার ছোট ভুলেও বড় ক্ষতি হতে পারে। তাই প্রতিটি তারিখ অ্যাডভোকেটের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
আসামি কি আপিল করতে পারেন?
১৩৮(১) ধারার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করতে হলে ডিজঅনার হওয়া চেকের অঙ্কের অন্তত ৫০ শতাংশ দণ্ডদানকারী আদালতে জমা দিতে হয়। এটি ১৩৮ক ধারায় বলা আছে।
বাস্তব অভিজ্ঞতায় সাধারণ ভুলগুলো
- ৩০ দিনের মধ্যে নোটিশ না পাঠানো। এটিই মামলা দুর্বল হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ।
- ভুল ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো বা ডাকের রসিদ হারিয়ে ফেলা।
- নোটিশের মেয়াদ শেষের পর এক মাসের সময়সীমা অবহেলা করা।
- লিখিত রসিদ ছাড়া আংশিক টাকা নেওয়া। আংশিক পরিশোধ হলে তা লিখিতভাবে রাখুন।
- একাধিক চেক এলোমেলোভাবে সামলানো। প্রতিটি চেকের নোটিশ ও মামলার পরিকল্পনা আগে করে নিন।
- মধ্যস্থতার নিয়ম না জেনেই মামলা করতে যাওয়া।
খরচ ও সময় কত লাগে?
কোর্ট ফি ও অ্যাডভোকেটের ফি মামলাভেদে আলাদা, তাই এখানে নির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ করা হলো না। আদালতে মামলার জট থাকায় নিষ্পত্তিতে সময় লাগতে পারে। কেউ ফলাফল বা নির্দিষ্ট তারিখের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
মূল কথা
- সময়মতো চেক জমা দিন, তারপর ৩০ দিনের মধ্যে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান।
- চেক-দাতাকে ৩০ দিন সময় দিন।
- এরপর এক মাসের মধ্যে মামলা করুন।
- মামলা শুরু হয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে (CMM বা CJM)। ৫ লাখ টাকা বা তার কম অঙ্কের বিচার ম্যাজিস্ট্রেট করেন, ৫ লাখ টাকার বেশি হলে যুগ্ম দায়রা জজ।
- আপনার জেলায় মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক কি না, আগেই জেনে নিন।
চেক ডিজঅনারের নোটিশ বা মামলা নিয়ে সময় নষ্ট না করে আজই আইনি পরামর্শ নিন।
দাবিত্যাগ: এই লেখা শুধু সাধারণ তথ্যের জন্য, এটি আইনি পরামর্শ নয়। আইন বদলায় এবং প্রতিটি মামলা আলাদা। কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে যোগ্য অ্যাডভোকেটের পরামর্শ নিন।
Frequently Asked Questions (FAQ)
Find clear, expert answers to the most common questions regarding this article below.
ব্যাংকের কাছ থেকে চেক ফেরতের খবর পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে চেক-দাতাকে লিখিত নোটিশ পাঠাতে হয়। এই সময় পার হলে মামলার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়। তাই ডিজঅনার স্লিপ হাতে পাওয়ার পর দেরি না করে অ্যাডভোকেটের মাধ্যমে নোটিশ পাঠানোই নিরাপদ।
নোটিশ পাওয়ার পর চেক-দাতা ৩০ দিন সময় পান। এই সময়ে টাকা না দিলে মামলার কারণ তৈরি হয়। এরপর এক মাসের মধ্যে আদালতে লিখিত অভিযোগ দাখিল করতে হয়। তারিখ গণনায় ভুল হলে ক্ষতি হতে পারে, তাই অ্যাডভোকেটের সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে নিন।
১৩৮ ধারায় সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, অথবা চেকের অঙ্কের তিন গুণ পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। বাস্তবে আদালত প্রায়ই টাকা আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেন। তবে রায় প্রতিটি মামলার তথ্য ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করে, তাই নির্দিষ্ট ফলের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
মামলা প্রথমে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দায়ের করতে হয়: মহানগরে সিএমএম, অন্যত্র সিজেএম। ২০২৬ সালের সংশোধনীর পর পাঁচ লাখ টাকা বা তার কম অঙ্কের চেকের বিচার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হয়। পাঁচ লাখ টাকার বেশি হলে বিচার যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে হয়।
চেক-দাতা নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধ করলে ১৩৮ ধারার অপরাধ গঠিত হয় না। আংশিক টাকা দিলে সেটি লিখিত রসিদে রাখুন এবং অ্যাডভোকেটের পরামর্শ নিন। শুধু মৌখিক লেনদেনের ওপর নির্ভর করবেন না, কারণ পরে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়।
হ্যাঁ। ১৩৮ ধারার (৩) উপধারা অনুযায়ী অনাদায়ী অংশের জন্য দেওয়ানি আদালতে যাওয়ার অধিকার চেক-গ্রহীতার বহাল থাকে। অর্থাৎ ফৌজদারি মামলা করলেও টাকা আদায়ের জন্য আলাদা দেওয়ানি পথ খোলা থাকে। কোন পথ আপনার জন্য ভালো, তা অ্যাডভোকেটের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করুন।
আইনগত সহায়তা প্রদান আইন সংশোধনের পর কিছু বিরোধে মামলার আগে লিগ্যাল এইড অফিসে মধ্যস্থতা বাধ্যতামূলক হয়েছে। ২০২৫ সালে চালুর সময় কম অঙ্কের চেক ডিজঅনার এর তালিকায় ছিল। নিয়মটি জেলা ধরে চালু হচ্ছে, তাই আপনার জেলায় প্রযোজ্য কি না আগে অ্যাডভোকেটের কাছে জানুন।
সাধারণত প্রতিটি ডিজঅনার চেকের জন্য আলাদা নোটিশ ও আলাদা মামলার প্রয়োজন হয়। একটি নোটিশে একাধিক চেক জুড়ে দিলে আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই একাধিক চেকের ক্ষেত্রে নোটিশ পাঠানোর আগেই অ্যাডভোকেটের সঙ্গে পরিকল্পনা করে নিন।
The information provided in this article is for educational and general informational purposes under Bangladesh laws and should not be construed as specific legal advice. For formal counsel regarding your litigation or commercial matters, please consult directly with Advocate Ataur Rahman at our chamber.